ইথিওপিয়া সীমান্ত থেকে দারফুর: তীব্র হচ্ছে সুদানের সংঘাত
সুদানে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সবচেয়ে সক্রিয় রণক্ষেত্রগুলো পূর্বে ইথিওপিয়া সীমান্তবর্তী ব্লু নিল রাজ্য থেকে শুরু করে তিনটি কর্দোফান রাজ্য পেরিয়ে পশ্চিমে দারফুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) এবং তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এসব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ বিভক্ত হয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে ড্রোন হামলার ব্যাপক বিস্তার ঐতিহ্যবাহী যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে দূরবর্তী শহর ও গ্রামগুলোতেও সংঘাত ছড়িয়ে দিচ্ছে।

যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রস্থল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ব্লু নিলের আল-বারাকা, বাকোরি, গেইসান ও কুরমুক; কর্দোফানের বারা, আল-আব্বাসিয়া ও কাউদা এবং দারফুরের উম বারু, কার্নোই ও আবু সুরুজ।
আল-বারাকা: কুরমুকের কাছে নতুন রণক্ষেত্র
দক্ষিণ-পূর্ব ব্লু নিল রাজ্যের কুরমুক এলাকার আল-বারাকা বর্তমানে সেনাবাহিনী এবং আরএসএফ ও তাদের মিত্র সুদান পিপলস লিবারেশন মুভমেন্ট-নর্থ (এসপিএলএম-এন)-এর মধ্যে অন্যতম নতুন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ইথিওপীয় সীমান্তের কাছে কুরমুকের উপকণ্ঠে অবস্থিত হওয়ায় সীমান্ত অঞ্চল ও ব্লু নিলের অভ্যন্তরীণ এলাকার মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে স্থানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুক্রবার সেনাবাহিনী জানায়, আল-বারাকায় আরএসএফ ও এসপিএলএম-এন-এর একটি যৌথ আক্রমণ তারা প্রতিহত করেছে। সেনাবাহিনীর চতুর্থ পদাতিক ডিভিশন জানায়, তাদের বাহিনী আক্রমণকারীদের জনবল ও সরঞ্জামের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে এবং তাদের সুদান-ইথিওপিয়া সীমান্তের দিকে পিছু হটতে বাধ্য করে।
বাকোরি: বিতর্কিত সামরিক ঘাঁটি
গেইসান এলাকার বাকোরি ব্লু নিলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতপূর্ণ কেন্দ্র। এলাকাটিতে একটি সামরিক ঘাঁটি এবং সেনাবাহিনীর ১৪তম ব্রিগেডের সদর দপ্তর অবস্থিত হওয়ায় এটি উভয় পক্ষের জন্যই নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বাকোরি রাজ্যের রাজধানী দামাজিন থেকে ১৭০ কিলোমিটার (১০৬ মাইল) দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আরএসএফ এবং এসপিএলএম-এন একই নামের দুটি প্রশাসনিক কেন্দ্র গেইসান ও কুরমুকের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তবে সেনাবাহিনী এখনো উভয় অঞ্চলের অন্যান্য অংশসহ দামাজিন, এর রোসাইরেস এবং বাউ, ওয়াদ আল-মাহি ও তাদামন এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
ইয়াবুস: ২০১১ সাল থেকে এসপিএলএম-এন-এর ঘাঁটি
কুরমুক ও গেইসানের বাইরে এসপিএলএম-এন নেতা আবদেলাজিজ আল-হিলুর বাহিনী ২০১১ সাল থেকে ইয়াবুস নিয়ন্ত্রণ করছে। ব্লু নিলে এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকাটি ইথিওপিয়া ও দক্ষিণ সুদান সীমান্তের কাছে এবং কুরমুক থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এসপিএলএম-এন ২০১১ সাল থেকে ব্লু নিল ও দক্ষিণ কর্দোফানে অধিকতর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সুদান সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছিল। পরবর্তীতে বর্তমান যুদ্ধের সময় তারা আরএসএফের সঙ্গে হাত মেলায়।
বারা: উত্তর কর্দোফানের কৌশলগত সংযোগস্থল
উত্তর কর্দোফানের বারা শহরটি জাতীয় রাজধানীর পশ্চিমে ওমদুরমানের সঙ্গে সংযোগকারী জাতীয় মহাসড়কে অবস্থিত হওয়ায় কৌশলগতভাবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত। জুলাইয়ের শেষের দিকে সেনাবাহিনী বারা, জাবরা আল-শেখ এবং উম সায়ালা পুনরুদ্ধার করে। এর ফলে মহাসড়কটির নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং দারফুর ও পশ্চিম কর্দোফান সীমান্তবর্তী রাজ্যটিতে সামরিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে।
এরপর থেকে বারার চারপাশের সংঘাত মূলত সরাসরি স্থলযুদ্ধ থেকে সামরিক অবস্থান ও আশেপাশের গ্রামগুলোতে ড্রোন হামলায় রূপ নিয়েছে। ইমার্জেন্সি লয়ার্স এবং সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, বারার পশ্চিমে কোনো সামরিক অবস্থান না থাকা সত্ত্বেও সেখানকার গ্রামগুলো আরএসএফের হামলার শিকার হয়েছে।
হামরাত আল-শেখ, আল-মাজরুব ও সোদারি
উত্তর কর্দোফানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সামরিক তৎপরতা ব্যাপকভাবে কেন্দ্রীভূত রয়েছে, যেখানে আরএসএফ হামরাত আল-শেখ, আল-মাজরুব ও সোদারি নিয়ন্ত্রণ করে। দারফুর ও পশ্চিম কর্দোফানের কাছাকাছি অবস্থান এবং দুটি অঞ্চলকে সংযুক্তকারী যাতায়াত ও সরবরাহ রুটে অবস্থিত হওয়ায় অঞ্চলগুলোর গুরুত্ব অনেক। দক্ষিণ ও পশ্চিম কর্দোফানের মতো উত্তর কর্দোফানেও দফায় দফায় ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
কাদুগলি ও ডিলিং: অবরোধ ভাঙার পরবর্তী পরিস্থিতি
দক্ষিণ কর্দোফানে কাদুগলি ও ডিলিং সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের মধ্যে রয়েছে। কয়েক মাস আগে সেনাবাহিনী এই দুটি শহরের অবরোধ ভেঙে দেয় এবং আল-হিলুর এসপিএলএম-এন নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো ছাড়া রাজ্যের একটি বড় অংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। শহর দুটির চারপাশে বড় ধরনের স্থলযুদ্ধ কমে গেলেও সেখানে এখনো থেমে থেমে ড্রোন হামলা চলছে, যাতে হতাহত হচ্ছেন সাধারণ বেসামরিক নাগরিকরা।
আল-আব্বাসিয়া: হামলার মুখে বাস্তুচ্যুতি
ঘন ঘন হামলা ও অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে দক্ষিণ কর্দোফানের আল-আব্বাসিয়া এলাকাটি আরেকটি সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানায়, ১ থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতির কারণে আল-আব্বাসিয়ার নয়টি গ্রাম থেকে ৬ হাজার ৪২০ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
কাউদা: সামরিক ফ্রন্ট ও স্থানীয় সংঘাত
দক্ষিণ কর্দোফানের দূর দক্ষিণে অবস্থিত কাউদা এসপিএলএম-এন-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এটি তাদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। সরকারের সঙ্গে এসপিএলএম-এন-এর বৃহত্তর সংঘাতের পাশাপাশি কাউদায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এসপিএলএম-এন বাহিনী এবং ওতোরো উপজাতির সদস্যদের মধ্যে স্থানীয় সংঘাতও দেখা গেছে। জুন মাসের শেষের দিকে শাওয়াইয়া ও ওতোরো উপজাতির মধ্যে সীমান্ত নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়, যার ফলে বহু মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
উম বারু ও কার্নোই: উত্তর দারফুরের প্রবেশদ্বার
দারফুর অঞ্চলের অন্যতম সক্রিয় রণক্ষেত্র উত্তর দারফুর, যেখানে সেনাবাহিনী এবং সশস্ত্র আন্দোলনগুলোর যৌথ বাহিনী আরএসএফের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। এই যৌথ বাহিনীতে মিনি আরকো মিন্নাবির নেতৃত্বাধীন সুদান লিবারেশন মুভমেন্ট এবং জিবরিল ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন জাস্টিস অ্যান্ড ইকুয়ালিটি মুভমেন্টের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনী উভয় এলাকার বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর উম বারু এবং কার্নোই গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতস্থল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। চাদ সীমান্তের কাছে অবস্থিত হওয়ায় উত্তর দারফুরের অন্যান্য অংশে অগ্রসর হওয়া এবং রাজ্যের সরবরাহ রুটগুলো সুরক্ষিত করার জন্য এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি।
কুলবুস, বীর সালিবা ও জেবেল মুন
পশ্চিম দারফুরে সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর তৎপরতা মূলত রাজ্য রাজধানী এল জেনেইনার উত্তরাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। জুনে যৌথ বাহিনী এল জেনেইনার প্রায় ১৬০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত কুলবুস দখল করে, তবে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় পর তারা সেখান থেকে সরে এসে শহরের চারপাশে পুনরায় অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে রাজ্যে তাদের অবস্থান সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী এবং যৌথ বাহিনী এল জেনেইনার উত্তরে বীর সালিবা ও জেবেল মুন দখল করে।
আবু সুরুজ: পশ্চিম দারফুরের সর্বশেষ যুদ্ধক্ষেত্র
২৯ আগস্ট পশ্চিম দারফুরের গভর্নর বাহর আল-দিন আদম কারামা জানান, আরএসএফের সঙ্গে সংঘর্ষের পর সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনী সিরবা এলাকার আবু সুরুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এল জেনেইনার উত্তরে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে আবু সুরুজ পশ্চিম দারফুরের অন্যতম সর্বশেষ এলাকা যেখানে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন ঘটেছে। দারফুরের বেশিরভাগ এলাকা এখনো আরএসএফ ও তাদের মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবে সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনী অঞ্চলটির উত্তর ও পশ্চিমের কিছু অংশে তাদের অবস্থান বজায় রেখেছে।
রণক্ষেত্র বিস্তারের সঙ্গে বাড়ছে বাস্তুচ্যুতি
প্রতিটি রণক্ষেত্রের কৌশলগত গুরুত্ব ভিন্ন হলেও সংঘাত বিস্তারের সবচেয়ে ধারাবাহিক পরিণতি হিসেবে দেখা দিচ্ছে মানবিক বিপর্যয় ও বাস্তুচ্যুতি। আইওএম জানিয়েছে, ব্লু নিলের কুরমুক এলাকার তিনটি গ্রাম থেকে ৩ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অন্যদিকে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গেইসানে সংঘাতের কারণে এক সপ্তাহে ২২ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।
দক্ষিণ কর্দোফানে আল-আব্বাসিয়ার গ্রামগুলো থেকে ৬ হাজার ৪২০ জন এবং কাউদার সংঘাতে আরও হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর পাশাপাশি ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও বেসামরিকদের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ড্রোন হামলায় অন্তত ১ হাজার ১০০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক রূপান্তর এবং নিয়মিত সেনাবাহিনীতে আধা-সামরিক বাহিনীকে একীভূত করার পরিকল্পনা নিয়ে বিরোধের জেরে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে এই যুদ্ধ চলছে। ব্লু নিল, কর্দোফান ও দারফুরের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রগুলো ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে থাকায় সুদানের সামরিক সংঘাতের মানচিত্র অস্থিতিশীল রূপ নিয়েছে এবং যুদ্ধের সমাপ্তির কোনো স্পষ্ট সম্ভাবনা এখনও দেখা যাচ্ছে না।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.