তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে নেতানিয়াহু
একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সংসদীয় নির্বাচনে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন ইসরায়েলের নাগরিকরা। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটতে পারে, কিংবা কোনো প্রধান জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটি আবারও রাজনৈতিক অচলাবস্থার মুখে পড়তে পারে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তী সময়ে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি আক্রমণসহ লেবানন ও ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম সাধারণ নির্বাচন।

টানা কয়েক দশক ধরে একের পর এক সরকারের চার বছরের মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই ভেঙে পড়ার পর, ১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম দেশটিতে যথাসময়ে কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রায় ৭৩ লাখ নাগরিক ভোট দেওয়ার যোগ্য, যার মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিক রয়েছেন।
দেশজুড়ে প্রায় ১৮ হাজার ব্যালট বাক্সসহ ১২ হাজার ১৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে। বেশিরভাগ কেন্দ্র সকাল ৭টা (গ্রিনিচ মান সময় ০৫:০০) থেকে খোলা হবে এবং রাত ১০টায় (গ্রিনিচ মান সময় ২০:০০) ভোটগ্রহণ শেষ হবে। নির্বাচন উপলক্ষে দেশটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
ইসরায়েলের আইনসভা নেসেটের ১২০টি আসনের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ৩৭টি দল ও নির্বাচনী জোট। দেশটিতে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থনের প্রয়োজন হয়। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার আওতায় ভোটাররা কোনো একক প্রার্থীর পরিবর্তে সরাসরি দলকে ভোট দেন। আইনসভায় প্রবেশের জন্য একটি দলকে প্রদত্ত বৈধ ভোটের অন্তত ৩.২৫ শতাংশ পেতে হয়। অতীতে কোনো দলই নেসেটে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি, যার ফলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন তা নির্ধারণে জোট গঠনের আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইসরায়েলের প্রধান তিনটি টেলিভিশন সম্প্রচারকের প্রকাশিত চূড়ান্ত জরিপ অনুযায়ী, সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকটের মধ্যপন্থী দল ‘ইয়াশার’ নেতানিয়াহুর দল লিকুদের চেয়ে সামান্য এগিয়ে রয়েছে। ইয়াশার ২২ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে এবং লিকুদ পেতে পারে ১৯ থেকে ২১টি আসন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন ‘বিয়াচাদ’ (টুগেদার) জোট ১৪ বা ১৫টি আসন পেয়ে তৃতীয় স্থানে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলানের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটস এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদোর লিবারম্যানের দল ‘ইসরায়েল বেইতেনু’ রয়েছে।
তিনটি জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও ধর্মীয় জোট ৫০টি আসন পেতে পারে, অন্যদিকে বিরোধী জোট পেতে পারে ৫২ থেকে ৫৬টি আসন। এ ছাড়া ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৪ থেকে ১৬টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে, নেতানিয়াহু বা আইজেনকট কারও জন্যই সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সহজ কোনো পথ নেই। নির্বাচনে সর্বোচ্চ আসন জয় পেলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না। প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ নির্বাচিত দলগুলোর সাথে আলোচনা করবেন এবং আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে এমন কোনো আইনপ্রণেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব অর্পণ করবেন।
৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াহু তিনটি পৃথক মেয়াদে ১৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর আবারও নতুন মেয়াদে ক্ষমতায় আসার লড়াই চালাচ্ছেন। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা মূলত জাতীয় নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়েছে, যেখানে তিনি আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে নিজের অভিজ্ঞতা ও সামরিক নীতিকে অপরিহার্য হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তবে ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতা, পরবর্তী সংঘাতগুলোর ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা ব্যর্থতা খতিয়ে দেখার জন্য স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনে আপত্তির কারণে তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। নেতানিয়াহু বর্তমানে দুর্নীতির অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা তিনি অস্বীকার করে আসছেন। এ ছাড়া গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
তাঁর সম্ভাব্য জোটের অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নেতৃত্বাধীন উগ্র ডানপন্থী দলগুলো। পাশাপাশি রয়েছে কট্টর অর্থোডক্স দল ‘শ্যাস’ ও ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম’। বেন-গভির ও স্মোট্রিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতা করেছেন এবং গাজা ছেড়ে ফিলিস্তিনিদের চলে যেতে উৎসাহ জুগিয়েছেন। কয়েক বছর ধরে চলা সামরিক সংঘাতে জনবল সংকটে ভোগার পরেও ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের জন্য সামরিক পরিষেবা থেকে ছাড় বহাল রাখার দাবিতে অর্থোডক্স দলগুলো ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকট ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের সামরিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ৭ অক্টোবরের হামলার পর নেতানিয়াহুর জরুরি সরকারে যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে গাজা আক্রমণের ব্যবস্থাপনা এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশলের অভাবের সমালোচনা করে তিনি সরকার ত্যাগ করেন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হয়ে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর ছেলে নিহত হন।
আইজেনকট তাঁর প্রচারণায় সরকারের জবাবদিহি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন এবং কট্টর অর্থোডক্স পুরুষদের জন্য ব্যাপক সামরিক অব্যাহতি বাতিলের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন।
নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করলেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যুতে আইজেনকট প্রায় একই ধরনের অবস্থান বজায় রেখেছেন। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি পূর্ণ সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন এবং জানান, গাজায় হামাসের সামরিক সক্ষমতা ও শাসন অবশ্যই ভেঙে দিতে হবে। ফলে এই নির্বাচন ভোটারদের সামনে নেতৃত্ব নির্বাচনের একটি ভিন্নধর্মী প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছে।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.