বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছে হ্যাকাররা। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ক্রিপ্টো ইতিহাসের বৃহত্তম চুরি, খোয়া গেল ৬.৩ বিলিয়ন ডলার
ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সের লোগো

চীনা বংশোদ্ভূত কানাডীয় ধনকুবের চ্যাংপেং ঝাও প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বৃহস্পতিবার লেনদেন ও অর্থ উত্তোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করে। তবে গ্রাহকদের সব তহবিল নিরাপদ রয়েছে এবং সম্ভাব্য সব ক্ষতিপূরণ প্রতিষ্ঠানটি নিজেই বহন করবে বলে জানিয়েছে তারা। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, এই নজিরবিহীন সাইবার হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়া জড়িত।

ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস এবং চেইন্যালাইসিস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে চুরির বড় অংশটি সংঘটিত হয়। হামলাকারীরা ১০টি ব্লকচেইনে থাকা বাইন্যান্সের ওয়ালেট থেকে প্রায় ৬৩৬ কোটি মার্কিন ডলার সরিয়ে নিয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাইবিট এক্সচেঞ্জ থেকে ১৫০ কোটি ডলার চুরির ঘটনাটি ছিল সর্বোচ্চ। বর্তমান সাইবার হামলায় সেই রেকর্ড ভেঙে গেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, চুরি হওয়া অর্থের মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ ইতিমধ্যে অবরুদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে স্টেবলকয়েন প্রস্তুতকারক টেথার ও সার্কেল অবরুদ্ধ করেছে ২৩০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ। তবে বাকি ৩৩০ কোটি ডলার কোথায় গেছে, সে বিষয়ে বাইন্যান্স এখনো স্পষ্ট কিছু জানায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বাইন্যান্স সতর্ক করে বলেছে, চুরি যাওয়া সম্পদের পরিমাণ ‘আরও বাড়তে পারে’। বর্তমানে তারা আরও সম্পদ শনাক্ত ও অবরুদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

অর্থ লেনদেন নজরদারিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, এই অপরাধের পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা রয়েছে। টিআরএম জানায়, অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকিং ইউনিট ‘ট্রেডারট্রেটর’ এই হামলা চালিয়েছে, যা মূলত ল্যাজারাস গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) তথ্য অনুযায়ী, ল্যাজারাস গ্রুপ মূলত দক্ষিণ কোরিয়া এবং দেশটির স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে গোয়েন্দাবৃত্তি, বিপর্যয় ও ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তু বানায়। এছাড়া আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যেও তারা নিয়মিত ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জে সাইবার অভিযান চালায়।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালে ল্যাজারাস গ্রুপের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, উত্তর কোরিয়ার প্রধান গোয়েন্দা ব্যুরোর মাধ্যমে ইউনিটটি পরিচালিত হয়। তবে পিয়ংইয়ং সব সময় হ্যাকিংয়ের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে এসেছে। চেইন্যালাইসিস ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ২০২৫ সালের বাইবিট হ্যাকিংয়ের ঘটনায়ও এই দলটিকে দায়ী করেছিল। টিআরএমের ভাষ্য অনুযায়ী, বাইবিট চুরির কৌশলের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে এবারও বাইন্যান্সের ওয়ালেট খালি করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ঠিকানায় অর্থ সরিয়ে নেয় হ্যাকাররা।

বাইন্যান্স অবশ্য কাউকে সরাসরি দায়ী করার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং এক্সে জানান, তাদের তদন্তে এখনো নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের নাম চিহ্নিত হয়নি। প্রাথমিকভাবে এক প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমে অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে ধারণা করা হলেও, শুক্রবার বাইন্যান্স জানায় যে তদন্তে আরও কিছু অনুপ্রবেশের পথ শনাক্ত হয়েছে। ক্রিপ্টো ওয়ালেটের ডিজিটাল পাসওয়ার্ড বা ‘প্রাইভেট কি’ ফাঁসের প্রমাণ মেলেনি বলে তারা দাবি করেছে। তবে ধসে পড়া টোকিও এক্সচেঞ্জ ‘মাউন্ট গক্স’-এর সাবেক প্রধান মার্ক কার্পেলেস রয়টার্সকে জানান, হ্যাকাররা সম্ভবত বাইন্যান্সের অন্তত দুটি প্রধান ওয়ালেটের নিয়ন্ত্রণকারী সংকেত পেয়ে গিয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলার মূল লক্ষ্য ছিল বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ। উত্তর কোরিয়া ক্রিপ্টো চুরির অভিযোগ অস্বীকার করলেও এটি পিয়ংইয়ংয়ের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। এই অর্থ তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সচল রাখতে এবং জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যয় মেটাতে সহায়তা করে। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার হিসাবে, গত পাঁচ বছরে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা ক্রিপ্টো ও অন্যান্য ভার্চ্যুয়াল সম্পদ থেকে প্রায় দেড় লাখ কোটি ওয়ান (১১০ কোটি ডলার) চুরি করেছে।

টিআরএম-এর বৈশ্বিক নীতিবিষয়ক প্রধান আরি রেডবর্ড আল জাজিরাকে বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া যখন এত বড় পরিসরে চুরি করে, তখন সেই অর্থ দিয়ে অস্ত্র বিস্তার এবং অন্যান্য অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। এটি কেবল সাধারণ ক্রিপ্টো চুরি নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।’

এই চুরির প্রভাবে ক্রিপ্টো বাজারে বড় ধরনের দরপতন শুরু হয়। তবে প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। বিটকয়েনের দর ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন ৭৬,৩৬৮ ডলারে নেমে আসে। ইথারের দাম ৩ শতাংশেরও বেশি কমে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ২,১৭৮ ডলারে দাঁড়ায়। ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়ার তথ্য দেওয়ার পরও অপর ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেসের শেয়ারদর কমেছে ৪.৮ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ সুদের হার এবং ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাওয়ায় ক্রিপ্টো বাজার এমনিতেই চাপের মুখে ছিল বলে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন।

চুরি যাওয়া অর্থের পরিমাণ বাইন্যান্সের জরুরি তহবিলের চেয়েও ছয় গুণ বেশি। ২০১৮ সালে যেকোনো সাইবার বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটি ১০০ কোটি ডলারের ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজার্স’ গঠন করেছিল, যা পুরোটাই বিটকয়েনে সংরক্ষিত। তবে প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রধান নির্বাহী টেং গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে জানান, প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব অন্যান্য তহবিল থেকেও যাবতীয় ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে।

এই সাইবার হামলার ঘটনা বড় ও কেন্দ্রীভূত ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলোর দুর্বলতাকে উন্মোচিত করেছে। সিডনির ম্যাককুয়ারি ইউনিভার্সিটির ক্রিপ্টো বাজার বিশেষজ্ঞ শন ফোলি আল জাজিরাকে বলেন, ‘কেন্দ্রীভূত এক্সচেঞ্জে থাকা যেকোনো সম্পদ এক্সচেঞ্জটির নিজস্ব সুরক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। কোনো এক্সচেঞ্জের তহবিল যত বড় হয়, সেটি হ্যাকারদের কাছে তত বড় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।’ প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় চুরি যাওয়া ক্রিপ্টোকারেন্সির জন্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ বেশ সীমিত। টিআরএম-এর অপরাধ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ১৫০টি সাইবার হামলায় হ্যাকাররা মোট ২৮৭ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো হাতিয়ে নিয়েছে।

বাইন্যান্স নিজেও এর আগে বড় ধরনের আইনি জটিলতায় পড়েছিল। প্ল্যাটফর্মে অর্থপাচার প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে ২০২৩ সালে দোষ স্বীকার করেছিলেন প্রতিষ্ঠাতা চ্যাংপেং ঝাও। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ক্ষমা প্রদর্শন করেন। শুক্রবার বাইন্যান্স নিশ্চিত করেছে, তারা বিষয়টি নিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করছে এবং পরবর্তী ৪৫ ঘণ্টার মধ্যে অর্থ উত্তোলন সেবা পুনরায় পুরোদমে চালু করা সম্ভব হবে।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.