আপনি পড়ছেন

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের মতো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে দেশটিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে গভীর রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শুক্রবার সকালে দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি (সিইসি) ২৭ অক্টোবরের ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করেছে, যেখানে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ।

ইসরায়েলের নির্বাচনী অচলাবস্থা কাটবে কীভাবে?
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে বিরোধী জোটের ব্যানার হাতে এক বিক্ষোভকারী

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট কিংবা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট—কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। একই সঙ্গে দুই নেতাই ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান দুটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ইউনাইটেড আরব লিস্ট (রাম) এবং জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে সরকারে অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার সেনা সদস্য ও কূটনীতিকদের প্রায় ৫ লাখ ‘ডাবল এনভেলপ’ বা দ্বৈত খামের ভোট গণনা সম্পন্ন হয়। এই প্রক্রিয়ায় পরিচয়হীন ব্যালটটি একটি গোপন খামে থাকে এবং সেই খামটি ভোটারের পরিচয় সংবলিত দ্বিতীয় খামে রাখা হয়। এর মাধ্যমে ভোটারদের পছন্দের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন না করেই দ্বৈত ভোটদান প্রতিহত করা হয়।

১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি আসন নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। এছাড়া ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রাম এবং জয়েন্ট লিস্ট যৌথভাবে ১৯টি আসন লাভ করেছে।

ইসরায়েলে সরকার গঠনের জন্য যেকোনো দল বা জোটকে অন্তত ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে হয়। দেশটিতে এখন পর্যন্ত কোনো একক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। তাই সবসময় একাধিক দলের সমন্বয়ে জোট সরকার গঠিত হয়ে আসছে।

বর্তমানে জোট সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ সরকার গঠনের সর্বাধিক সম্ভাবনা থাকা যেকোনো প্রার্থীকে দায়িত্ব দিতে পারেন। মনোনীত প্রার্থী সরকার গঠনের জন্য প্রায় ২৮ দিন সময় পাবেন, যা পরবর্তীতে আরো বাড়ানো হতে পারে।

প্রথম মনোনীত প্রার্থী ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য কোনো সদস্যকে সেই সুযোগ দিতে পারেন। দ্বিতীয় প্রার্থীও ব্যর্থ হলে ২১ দিনের একটি বিশেষ সময়সীমা উন্মুক্ত হয়। ওই সময়ের মধ্যে নেসেটের যেকোনো ৬১ জন সদস্য প্রেসিডেন্টের কাছে কোনো একজন সংসদ সদস্যকে দায়িত্ব দেওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানাতে পারেন। এই সকল পদক্ষেপ ব্যর্থ হলে ইসরায়েলি নাগরিকদের পুনরায় নির্বাচনের জন্য ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে।

ইসরায়েলের অধিকাংশ শীর্ষ নেতাই আরব দলগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের তীব্র বিরোধিতা করছেন। নির্বাচনে আরব দলগুলোর শক্তিশালী অবস্থানের পর নেতানিয়াহু তাদের সঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা নাকচ করে তাদের আক্রমণ করেছেন। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘তাদের সঙ্গে সরকার গঠন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।’

নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি নিজেদের জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচন ‘চুরি’ করার অভিযোগ তুলেছে।

টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী আইজেনকট জানান, ইসরায়েলকে একটি ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, স্বাধীনতা ঘোষণার মূল্যবোধ সমর্থন করা এবং সকল নাগরিকের জাতীয় সেবায় অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিলে তবেই যেকোনো দলের সঙ্গে জোট বিবেচনা করবেন তিনি। তবে আরব দলগুলো এসব শর্তের আওতায় পড়বে কি না, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।

বৃহস্পতিবার চরম ডানপন্থি দল ইসরায়েল বেইতেনুর নেতা আভিগদোর লিবারম্যানও নির্দিষ্ট কিছু জোট গঠনের বিরোধিতা করেন। নেতানিয়াহু ও জয়েন্ট লিস্টের অংশ তাল পার্টির নেতা আহমেদ তিবিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘বিবি কিংবা তিবি—কাউকেই নয়।’

এদিকে আরব দলগুলো নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের আগ্রহ দেখিয়েছে। জয়েন্ট লিস্টের ইউসেফ জাবারিন বলেন, রক্তপাতের রাজনীতি পরিচালনাকারী নেতানিয়াহু সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তাদের দল প্রস্তুত রয়েছে। এক্সে তিনি লেখেন, ‘আধিপত্যবাদ, বর্ণবাদ ও বর্জনের রাজনীতির বিপরীতে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিকল্পের প্রস্তাব দিচ্ছি। এই পরিবর্তন ইহুদি-আরব সমতাভিত্তিক প্রকৃত অংশীদারত্বের মাধ্যমেই আসতে পারে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ নাজার জানান, আইজেনকট এবং তার মিত্রদের চেয়ে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো অনেক বেশি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করেছে। রাম দল আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিতে প্রস্তুত রয়েছে। অপরদিকে সমতা রক্ষা, ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকায় সহিংস অপরাধ দমন, বসতবাড়ি উচ্ছেদ বন্ধ এবং সামগ্রিক ফিলিস্তিন সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি পেলে বাইরে থেকে সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে জয়েন্ট লিস্ট।

এসেক্স ইউনিভার্সিটির প্রভাষক ও নির্বাচনি কৌশল বিশেষজ্ঞ রোই জুর আল জাজিরাকে জানান, কোনো পক্ষের জন্যই প্রয়োজনীয় সংখ্যার হিসাব মিলছে না। তিনি বলেন, আরব সম্প্রদায়ের জন্য আর্থিক বরাদ্দের বিনিময়ে সরকার গঠনের ভোটাভুটিতে আইজেনকট আরব দলগুলোর সমর্থন চাইতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। তবে উভয় পক্ষের জন্যই এটি ঘটার সম্ভাবনা কম। এছাড়া বিষয়টি এগোলেও লিবারম্যানের বিরোধিতার মুখে তা বাতিল হতে পারে। আইজেনকটের জোটের আসন সংখ্যা আরেকটু বেশি হলে রাম দলের সমর্থনে ইউরোপীয় ধাঁচের একটি সমঝোতা সরকার গঠন সহজ হতো।

বার্লিনভিত্তিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গ আল জাজিরাকে জানান, আইজেনকট আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করবেন কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি তিনটি সম্ভাব্য বিকল্পের কথা উল্লেখ করেন। প্রথমত, আরব দলগুলো সরাসরি সরকারে অংশ নিতে পারে, যা রাম চাইলেও জয়েন্ট লিস্ট এই মুহূর্তে চায় না। দ্বিতীয়ত, মন্ত্রিসভায় কোনো পদ ছাড়াই তারা ২০২১-২০২২ সালের বেনেত সরকারের মতো জোটের সাধারণ অংশীদার হতে পারে। তৃতীয়ত, তারা সরকারের বাইরে থেকে সমর্থন দিয়ে সরকারকে টিকিয়ে রাখতে পারে।

বিশ্লেষক আহমেদ নাজার উল্লেখ করেন, মূল সমস্যা আরব দলগুলোর বাস্তববাদের অভাব নয়; বরং ফিলিস্তিনি নাগরিকদের নির্বাচিত ১৯ জন প্রতিনিধিকে বৈধ রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে মানতে আইজেনকট ও তার সহযোগীদের অস্বীকৃতিই প্রধান বাধা। তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর জোটের বাইরে ৬৭টি আসন থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এমন আচরণ করছে যেন ওই ১৯টি আসনের কোনো মূল্য নেই। ফিলিস্তিনিদের ভোট দিয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাওয়া হলেও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ভোটাধিকার প্রয়োগের পর ফলাফল যখন নির্ণায়ক হয়ে ওঠে, তখনই তাদের রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। এটি এক গভীর গণতান্ত্রিক বৈপরীত্য।

চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ ফেলো ইয়োসি মেকেলবার্গ আল জাজিরাকে জানান, ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখনো সমঝোতার চেষ্টা চালাতে পারেন। তিনি আইজেনকট ও অন্যদের রাজি করানোর চেষ্টা করতে পারেন এবং বিকল্প সরকার গঠন প্রতিহত করতে আরব দলগুলোকে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে পারেন।

নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গ মনে করেন, নেতানিয়াহু সম্ভবত পুনরায় নির্বাচনের দিকেই যেতে চাইবেন। তার ধারণা, নতুন নির্বাচনে আরব ভোটারদের উপস্থিতি কমে যাবে এবং বিরোধীরা হতাশায় ভুগবে। ফলে নতুন নির্বাচনে তার দল ৬১টি আসন পেয়ে যাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। এছাড়া তিনি বিরোধী ব্লকের বেনেত বা লিবারম্যানের দলকে নিজের সঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন, যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে আল জাজিরার নুর ওদেহ এই নির্বাচনকে ফিলিস্তিনি ইসরায়েলিদের জন্য একটি ‘অস্তিত্বের মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বিশ্লেষক আহমেদ নাজার বলেন, ফলাফলটি ইসরায়েলের ফিলিস্তিনিদের জন্য একই সঙ্গে বড় অর্জন ও একটি পরীক্ষা। তারা বিপুল সংখ্যায় ভোট দিয়ে নজিরবিহীন প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে এবং তাদের হাতে এখন নেতানিয়াহুর পুনরায় সরকার গঠন ঠেকানোর ক্ষমতা রয়েছে। তবে তাদের এই বার্তাই দেওয়া হচ্ছে যে, তাদের ভোট বাস্তব ক্ষমতায় রূপ না নেওয়া পর্যন্তই কেবল গ্রহণযোগ্য।

তিনি আরো বলেন, গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের কাছে এই নির্বাচন দখলদারিত্ব বনাম শান্তির লড়াই নয়। এটি মূলত ইসরায়েলে কারা ক্ষমতায় বসবে সেই লড়াই। ফিলিস্তিনিরা সামরিক দখলদারিত্ব, অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ এবং কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার হয়েই থাকবে কি না, তা নিয়ে কোনো পরিবর্তন আসবে না। ফিলিস্তিনিরা যেকোনো নতুন নেতৃত্বকে কেবল তাদের নীতির ভিত্তিতে বিচার করবে। বিশেষ করে গাজায় সহিংস হামলা ও আগ্রাসন বন্ধ, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা রোধ এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের স্বীকৃতির ওপরই তাদের মূল্যায়ন নির্ভর করবে।

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.