অ্যালুমিনিয়াম পাত্রের সিসা ব্যাহত করছে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ
স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র থেকে খাবারে মিশছে বিষাক্ত ধাতু সিসা, যা শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠন, শেখার ক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যে ক্ষতি ডেকে আনছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির এক বিজ্ঞপ্তিতে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নতুন কিংবা পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে প্রথমবার রান্না করা প্রতি কেজি সাদা ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত সিসা পাওয়া গেছে। অথচ শিশুদের খাদ্যে সিসার উপস্থিতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা হলো প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম। সেই হিসাবে গবেষণায় প্রাপ্ত মাত্রাটি অনুমোদিত সীমার চেয়ে ৩০ থেকে ৪২ গুণ বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উল্লেখ করেছে, রক্তে সিসার উপস্থিতির কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। এই বিষাক্ত উপাদানটি শিশুদের আচরণ, মনোযোগ ও বুদ্ধিমত্তার বিকাশে স্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নেচার পাবলিশিং গ্রুপের ‘জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি’ সাময়িকীতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিং সেন্টার অন গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের সহায়তায় এই অনুসন্ধান চালানো হয়। এতে বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিবার থেকে সংগৃহীত সাতটি ব্যবহৃত এবং বাজার থেকে সংগৃহীত ২০টি নতুন অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে সাদা ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে সিসার মাত্রা পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, নতুন ও পুরোনো উভয় পাত্র থেকেই সিসা খাবারে প্রবেশ করছে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে নতুন পাত্র থেকে সিসা নির্গমনের হার কিছুটা হ্রাস পেলেও তা নিরাপদ মাত্রার নিচে নামে না। ব্যবহৃত সাতটি পুরোনো পাত্রের মধ্যে ছয়টিতেই রান্নার পর ভাতে সিসা পাওয়া গেছে। গবেষকদের প্রস্তুত করা মডেল অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলের শিশুদের ভাত গ্রহণের গড় পরিমাণ বিবেচনায় নিলে, তারা এসব পাত্রে তৈরি খাবার থেকে এফডিএর নির্ধারিত সীমার চেয়ে দৈনিক পাঁচ গুণেরও বেশি সিসা শরীরে গ্রহণ করতে পারে।
অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র পরিষ্কারের পদ্ধতির ওপরও খাবারে সিসা মেশার মাত্রা নির্ভর করে। নতুন পাত্র স্টিলের তারের মাজুনি দিয়ে ঘষলে সাধারণ ব্যবহারের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি সিসা নির্গত হয়। রান্নার কাজে ধাতব খুন্তি ব্যবহারের ফলেও খাবারে সিসার পরিমাণ বাড়ে। গবেষকদের ধারণা, পুরোনো স্ক্র্যাপ বা ধাতব বর্জ্য গলিয়ে কোনো ধরনের মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা ছাড়াই পাত্র তৈরি করায় এই ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সিসার নিজস্ব কোনো স্বাদ, গন্ধ বা বর্ণ না থাকায় চকচকে নতুন পাত্রও নিরাপদ কি না, তা খালি চোখে নির্ণয় করা অসম্ভব।
আইসিডিডিআরবির এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ বিভাগের সহকারী বিজ্ঞানী ড. জেসমিন সুলতানা জানান, খাবার তৈরিতে, বিশেষ করে শিশুদের খাবারের ক্ষেত্রে খাদ্যনিরাপত্তার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ পাত্র ব্যবহার করা দরকার। তিনি রান্নার পাত্র তারের মাজুনি দিয়ে ঘষা এবং অম্লীয় বা টকজাতীয় খাবার এসব পাত্রে রান্না করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের সতর্কতা দূষিত পাত্রকে সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত করতে পারে না।
গবেষকদের মতে, ব্যক্তিগত সতর্কতা ছাড়াও তৈজসপত্র তৈরির কাঁচামাল যাচাই, কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং প্রস্তুতকৃত পাত্রের মান পর্যবেক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) তদারকি অত্যন্ত জরুরি। আইসিডিডিআরবির সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রকল্পের সমন্বয়ক ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, তৈজসপত্র থেকে খাবারে সিসা স্থানান্তরের বিষয়ে স্পষ্ট নিরাপত্তা মান নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তিনি বিএসটিআইকে এই সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট মান প্রণয়ন ও তা কার্যকরের আহ্বান জানান। সাশ্রয়ী মূল্যের রান্নার সামগ্রী কোনোভাবেই অনিরাপদ হওয়া উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এটি পরীক্ষাগারে পরিচালিত একটি সীমিত পরিসরের গবেষণা। শিশুদের শরীরে সিসা প্রবেশের পরিমাণটি সরাসরি পরীক্ষা না করে হিসাবের মডেল দিয়ে অনুমান করা হয়েছে। তাই এই বিষয়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে গবেষণা পরিচালনা করা দরকার।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.