নদী শুকিয়ে পানিশূন্য ইউরোপ, ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ ও পণ্য পরিবহন
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাতের অভাব ও তীব্র গরমে ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ খরা দেখা দিয়েছে। এর ফলে মহাদেশটির ফসল উৎপাদন, পানীয় জলের সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। ট্রায়োডস ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খরা ও অতিরিক্ত গরমের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অর্থনীতিতে প্রায় ১৮ হাজার কোটি ইউরো ক্ষতি হতে পারে, যা ২০২৬ সালের প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির বড় অংশই মুছে ফেলবে।

ইউরোপের এই অবনতিশীল খরা পরিবহন, কৃষি ও জ্বালানি উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। নদীগুলোর পানি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দীর্ঘস্থায়ী গরমে মহাদেশটির বিস্তীর্ণ এলাকার মাটির আর্দ্রতা শুকিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশনের জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টারের (জেআরসি) সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, জুলাই মাসে ইউরোপের বেশিরভাগ অঞ্চলে খরা পরিস্থিতি স্থিতিশীল ও সংকটজনক ছিল। ফ্রান্স, দক্ষিণ জার্মানি, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র এবং স্লোভাকিয়াসহ মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
রাইন ও লোয়ার থেকে শুরু করে পো, দানিউব এবং তিসা নদীর পানি দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাতের ঘাটতি ও টানা তাপপ্রবাহের কারণে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এতে জ্বালানি সরবরাহ, শিল্প পরিবহন, সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
জার্মানির প্রধান শিল্প জলপথ রাইন নদীর পানি কমে যাওয়ায় পণ্যবাহী নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফেডারেল ওয়াটারওয়েজ অ্যান্ড শিপিং অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের সবচেয়ে ব্যস্ত অভ্যন্তরীণ জলপথ রাইন দিয়ে জার্মানির প্রায় ৮০ শতাংশ অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন করা হয়। তবে রাইনল্যান্ড-প্যালাটিনেটের কাউবের কাছে বেশিরভাগ নৌযান আর স্বাভাবিক পণ্য নিয়ে চলাচল করতে পারছে না। ফলে পণ্য পরিবহনকারীদের জন্য নদীটি কার্যকরভাবে উত্তর ও দক্ষিণ অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই ব্যাঘাতের প্রভাব পড়েছে পূর্ব ফ্রান্সেও। সেখানে নৌযানগুলো স্বাভাবিক পণ্য নিয়ে স্ট্রাসবার্গ বন্দরে পৌঁছাতে পারছে না।
ফরাসি দৈনিক লু ফিগারোকে স্ট্রাসবার্গের ফরাসি জলপথ কর্তৃপক্ষের উন্নয়ন পরিচালক জ্যঁ-লরেন্ট কিস্টলার জানান, স্বাভাবিক অবস্থায় তেলবাহী ট্যাংকারগুলো ১ হাজার ৫০০ টনের বেশি জ্বালানি বহন করলেও বর্তমানে সেগুলো মাত্র ৩৫০ টন জ্বালানি বহন করছে।
শুক্রবার পর্যন্ত ফ্রান্সের গ্র্যান্ড এস্ট অঞ্চলের ১৪ শতাংশ ফিলিং স্টেশনে অন্তত এক ধরনের জ্বালানি শেষ হয়ে গিয়েছিল, যেখানে দেশব্যাপী এই হার ছিল ৩ শতাংশ। হাউট-রিন এবং পার্শ্ববর্তী টেরিটরি ডি বেলফোর্টের কিছু অংশে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়ায় লোয়ার ডিপার্টমেন্টের কর্তৃপক্ষ অষ্টম খরা ডিক্রি জারি করেছে। কিছু এলাকা সর্বোচ্চ সংকট ক্যাটাগরিতে প্রবেশ করেছে, যেখানে পানির ব্যবহার কেবল জরুরি স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।
উত্তর ইতালির পো অববাহিকাকে পানির তীব্রতার সবচেয়ে গুরুতর শ্রেণিবিভাগে রাখা হয়েছে। প্রায় সব মনিটরিং স্টেশনে তীব্র খরা রেকর্ড করা হয়েছে। ক্রেমোনা এবং বোরগোফোর্টের পরিস্থিতিকে চরম হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। ইতালীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে নদীর তলদেশ আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে এবং আশপাশের কৃষিজমি এক বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি শুষ্ক। ইতালির অন্যতম প্রধান চাল উৎপাদনকারী অঞ্চল লোমেলিনায় সেচের পানি পালা করে বিতরণ করা হচ্ছে। সেখানে কৃষিতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ১০ কোটি ইউরোর বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পো বদ্বীপে স্বাদু পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় অ্যাড্রিয়াটিক সাগর থেকে লবণাক্ত পানি উজানে প্রবেশ করছে, যা নদীর পানিকে সেচের অনুপযোগী করে তুলছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘতম নদী দানিউব ১০টি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরিবহন, সেচ, জ্বালানি ও পানীয় জলের গুরুত্বপূর্ণ উৎস এই নদীটিও তীব্র হাইড্রোলজিক্যাল খরার সম্মুখীন হচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪ আগস্ট বুদাপেস্টে নদীর পানি রেকর্ড ১৪ থেকে ১৯ সেন্টিমিটারে নেমে আসে। এতে নদীর তলদেশের বড় অংশ, জাহাজের ধ্বংসাবশেষ এবং রক অব স্টারভেশন বা অনাহারের পাথর জেগে ওঠে, যা ঐতিহাসিকভাবে ফসলহানি ও ক্ষুধার সতর্কতা হিসেবে দেখা হয়। সেজেন্টেন্ড্রের কাছে নদীর কিছু অংশ এতটাই অগভীর হয়ে পড়ে যে পায়ে হেঁটে পার হওয়া যাচ্ছিল। সেখানে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার পরিবার সাময়িকভাবে পানীয় জলের সুবিধা হারায়।
পানির এই অবনতি হাঙ্গেরির পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। কেন্দ্রটি শীতল করার জন্য দানিউবের ওপর নির্ভরশীল এবং এটি দেশের প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। নদীর পানি আরও কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো হতে পারে, এমন সতর্কবার্তার মধ্যে কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে পানির স্তর বাড়াতে ৮০ মিটারের দুটি বার্জ ডোবানোর কাজ শুরু করে। রোমানিয়ায় প্রবেশের মুখে বাজিয়াসে দানিউবের পানি প্রবাহ আগস্টে প্রতি সেকেন্ডে ১ হাজার ৪০০ ঘনমিটারে নেমে আসে, যা আরও কমে ১ হাজার ৩০০ ঘনমিটারে দাঁড়াতে পারে। এটি আগস্টের দীর্ঘমেয়াদি গড়ের (৩ হাজার ৯০০ ঘনমিটার) প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই খরা দুটি পরস্পর সম্পর্কিত কারণের ফলে সৃষ্ট একটি মিশ্র সংকট। এর একটি হলো দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাতের ঘাটতি এবং অন্যটি হলো চরম তাপপ্রবাহ, যা মাটি, নদী ও গাছপালা থেকে পানি শুকিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। শীত ও বসন্তের শুরুতে উত্তর ও মধ্য ইউরোপের ওপর স্থায়ী উচ্চচাপ বলয় আটলান্টিকের আবহাওয়া ব্যবস্থাকে জার্মানি, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া এবং বাল্টিক অঞ্চলে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ঘটাতে বাধা দেয়। এপ্রিল থেকে এই উচ্চচাপ বলয় পশ্চিম দিকে প্রসারিত হয়ে আইবেরিয়ান উপদ্বীপ, ফ্রান্স এবং উত্তর ইতালিতে বৃষ্টিবাহী মেঘ পৌঁছাতে বাধা দেয়।
জুন মাসে দক্ষিণ ইউরোপ থেকে গরম বাতাস উত্তর দিকে অগ্রসর হওয়ায় পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী পরিষ্কার আকাশ ও রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা দেখা দেয়। অতিরিক্ত গরমের কারণে মাটি ও গাছপালা থেকে আর্দ্রতা বায়ুমণ্ডলে মিশে যাওয়ার হার বেড়ে যায়। আগে থেকেই শুষ্ক থাকা মাটি আরও বেশি তাপ শোষণ করে, যা উষ্ণায়ন ও পানি শুকিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করে। এর ফলে কম বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট প্রাথমিক আবহাওয়াগত খরা মাটি শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি খরায় রূপ নেয়। এরপর নদী, হ্রদ ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ায় তা হাইড্রোলজিক্যাল খরায় পরিণত হয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ২০২৬ সালে রেকর্ড করা মাটির আর্দ্রতার ঘাটতির মতো পরিস্থিতি এখন পশ্চিম ইউরোপে প্রায় পাঁচ গুণ এবং পূর্ব ইউরোপে ১১ গুণ বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া খাতগুলোর মধ্যে কৃষি অন্যতম। জেআরসি তাদের শীতকালীন ফসলের ফলনের পূর্বাভাস আগের মাসের তুলনায় ১ থেকে ৪ শতাংশ কমিয়েছে। এছাড়া ভুট্টা ও সূর্যমুখীর প্রাক্কলন ৬ থেকে ৭ শতাংশ কমানো হয়েছে। ফ্রান্সে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম ভুট্টা উৎপাদন হতে যাচ্ছে। রোমানিয়ায় ১০ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে ভুট্টার আবাদ নষ্ট হয়েছে। মধ্য-পশ্চিম ফ্রান্স, দক্ষিণ চেক প্রজাতন্ত্র, পশ্চিম স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি এবং পশ্চিম রোমানিয়া প্রধান কৃষি হটস্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে। জার্মানি, স্পেন এবং ইতালিতেও ফসল উৎপাদনের প্রত্যাশা কমেছে।
নদীর পানি কমে যাওয়ায় একই সঙ্গে পরিবহন খরচ বাড়ছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে। পারমাণবিক ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো শীতল করার জন্য নদীর পানির প্রয়োজন হয়, অন্যদিকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন নদী ও জলাধারের পর্যাপ্ত পানির ওপর নির্ভরশীল। জেআরসির তথ্য অনুযায়ী, নদীর পানি অতিরিক্ত গরম বা প্রবাহ খুব কম হওয়ার কারণে জুনের শেষের দিকের তাপপ্রবাহের সময় ফ্রান্সে তিনটি পারমাণবিক চুল্লি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অন্য আটটি চুল্লি কম ক্ষমতায় চালানো হয়।
ট্রায়োডস ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, খরা এবং চরম তাপপ্রবাহ ২০২৬ সালে ইইউর অর্থনৈতিক উৎপাদন প্রায় ১ শতাংশ বা প্রায় ১৮ হাজার কোটি ইউরো কমিয়ে দিতে পারে। এই প্রাক্কলিত ক্ষতি ইউরোপীয় কমিশনের প্রত্যাশিত ১.১ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশই মুছে ফেলবে। শুধুমাত্র গরমের কারণে শ্রমশীলতা হ্রাসের ফলে ইইউর মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ০.৬ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.