শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় কঠোর নতুন আইনের মাধ্যমে প্রযুক্তি জায়ান্টদের বাড়তি দায়িত্ব নিতে বাধ্য করতে প্রস্তুত রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুখোমুখি হতে জোটটির কোনো দ্বিধা নেই বলে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।

শিশুদের সুরক্ষায় টেক জায়ান্টদের মুখোমুখি হতে ভয় পায় না ইইউ
ইউরোপীয় কমিশনার গ্লেন মিকালেফ

বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ কথা জানান আন্তঃপ্রজন্মীয় ন্যায্যতা, তরুণ, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াবিষয়ক ইউরোপীয় কমিশনার গ্লেন মিকালেফ। সম্প্রতি প্রস্তাবিত ‘ইইউ কিডস অ্যাক্ট’ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন তিনি।

গ্লেন মিকালেফ বলেন, ‘আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে এবং তারা যেন নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে কাঁধে তুলে নেয় তা নিশ্চিত করতে ভীত নই।’

প্রস্তাবিত এই আইনের আওতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নিরাপদ করার বড় ধরনের দায়িত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি বয়স-ভিত্তিক বিধিনিষেধ আরোপ, কঠোর বয়স যাচাইকরণ ব্যবস্থা এবং আসক্তি তৈরি করতে পারে বা ক্ষতিকর—এমন প্রযুক্তিগত নকশার ক্ষেত্রে নতুন বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

মিকালের মতে, শিশুদের অনলাইন সুরক্ষার দায়িত্ব কীভাবে অভিভাবক, সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হবে—এই আইনের মাধ্যমে সেখানে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।

তিনি বলেন, ‘একজন অভিভাবক ঘরে খাওয়ার টেবিলে সন্তানদের জন্য নিয়ম ঠিক করে দিতে পারেন, কিন্তু আসক্তি তৈরির উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে নকশা করা অ্যালগরিদমের বিরুদ্ধে অভিভাবকরা লড়াই করবেন—এমনটি আশা করা যায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হলো সেই সব প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেশন ও প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর অধিকতর দায়িত্ব অর্পণ করা, যারা শিশুদের উপস্থিতিসম্পন্ন অনলাইন পরিসরগুলো তৈরি করছে।’

কমিশনের এই পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বয়সের ভিত্তিতে একটি পর্যায়ক্রমিক প্রবেশাধিকার ব্যবস্থা চালু করা। এ বিষয়ে মিকালেফ বলেন, ‘বয়স যত কম হবে, সুরক্ষাব্যবস্থাও তত বেশি জোরদার হবে।’

প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। অন্যদিকে ১৩ ও ১৪ বছর বয়সীদের জন্য ‘মিনি অ্যাকাউন্ট’ চালু করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সরাসরি তাদের মা-বাবা বা বৈধ অভিভাবকের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

মিকালেফ বলেন, ‘আমরা বয়স-ভিত্তিক সুরক্ষার কথা বলছি। যারা এই প্ল্যাটফর্ম বা মাধ্যমগুলো তৈরি করছে, তাদের ওপরই দায়িত্ব থাকবে যাতে ব্যবহারকারীদের জন্য এটি পুরোপুরি নিরাপদভাবে নকশা করা হয়।’

কমিশন যে ইতোমধ্যে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবার নিরাপত্তা নিয়ে তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, তার প্রমাণ হিসেবে ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট বাস্তবায়নের বিষয়টি তুলে ধরেন মিকালেফ। তিনি বলেন, ‘আমরা প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা, সংলাপ ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে এই কাজটি করছি।’

কমিশনের এই নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ক্ষতি সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্মগুলো শুরু থেকেই নিরাপদভাবে তৈরি করা হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেই প্রমাণ করতে হবে।

এই প্রস্তাব শিশুদের অনলাইন স্বাধীনতা খর্ব করার প্রয়াস—এমন ধারণা নাকচ করে দেন মিকালেফ। তিনি বলেন, ‘এটি মূলত অভিভাবকদের সহায়তা করার একটি উদ্যোগ। অনলাইন পরিবেশের নানাবিধ ঝুঁকির মধ্যে সন্তানদের বেড়ে ওঠা নিয়ে বহু অভিভাবক গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’

তিনি জানান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো অত্যন্ত জটিল অ্যালগরিদম ও ব্যবহারকারীদের ধরে রাখার কৌশলে তৈরি হওয়ায় অভিভাবকরা এমন এক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা কেবল পারিবারিক নিয়মের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই এই দায়িত্ব অভিভাবক, শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক এবং অনলাইন সেবা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভাগ করে নেওয়া আবশ্যক।

মিকালেফ বলেন, ‘আমরা স্বীকার করি যে অভিভাবকদের দায়িত্ব রয়েছে। আবার আইনপ্রণেতা ও নীতিনির্ধারক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে এবং এই নিয়মগুলো সামনে এনে আমরা সেই দায়িত্ব পালন করছি। শিক্ষাবিদদেরও ভূমিকা রয়েছে, তবে একই সঙ্গে এই পরিসরগুলো যেন নিরাপদ থাকে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও বর্তায়।’

এই প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত আইনে পরিণত হয়নি এবং এটিকে ইইউর আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া পার হতে হবে। পরবর্তীতে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং ইইউ কাউন্সিলে এটি পর্যালোচনা করা হবে, যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলো আলোচনায় অংশ নেবে।

শিশুদের সুরক্ষা জোরদার করার বিষয়ে একটি সমন্বিত ঐকমত্য তৈরি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মিকালেফ। তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে শিশুদের রক্ষা করা এবং অভিভাবকদের সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে সবার একটি অভিন্ন বোঝাপড়া রয়েছে।’

তবে এই পদক্ষেপ বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ করার সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা শিশুদের সুরক্ষার কথা বলছি, এটি আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। আমাদের তা প্রমাণ করতে হবে এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’

মিকালেফ জোর দিয়ে বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পাশাপাশি বাস্তব জীবনে শিশুদের বিকাশ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, ‘অনলাইন মাধ্যমগুলোকে আরও নিরাপদ ও সুরক্ষিত করা আমাদের মূল অগ্রাধিকার। তবে এটি শিশু ও তরুণ নীতিমালার অর্ধেক কাজ মাত্র। বাস্তব পৃথিবীতে শিশুদের সুস্থ বিকাশ ও সময় কাটানোর জন্য পর্যাপ্ত ও আকর্ষণীয় বিকল্প পরিবেশ নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব।’

এ ক্ষেত্রে শিশুদের পর্দা বা স্ক্রিন থেকে দূরে রেখে সুস্থ সামাজিকীকরণের স্থান হিসেবে ক্রীড়া অবকাঠামো, উন্মুক্ত পার্ক, পাঠাগার ও থিয়েটারের মতো ক্ষেত্রগুলোতে জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এছাড়া ইউরোপীয় কমিশনার ফুটবল পরিচালনা এবং বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার ভূমিকা নিয়ে চলমান বিতর্ক নিয়েও কথা বলেন।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.