এআই বদলে দিচ্ছে বিপণন ব্যবস্থা, আসছে ‘সাইটেশন ইকোনমি’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত সার্চ ইঞ্জিন এবং ভার্চুয়াল সহকারীগুলো ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থায় বড় ধরনের রূপান্তর ঘটাচ্ছে। ক্লিকের ওপর নির্ভর করার পুরনো ধারণার বদলে ইন্টারনেটে এখন ‘সাইটেশন ইকোনমি’ বা তথ্যসূত্রভিত্তিক ব্যবস্থার সূচনা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জেনারেটিভ এআই কনটেন্টের মাত্রাতিরিক্ত ভিড়ে ব্র্যান্ডগুলোর টিকে থাকতে মৌলিক ও যাচাইযোগ্য কনটেন্ট তৈরি করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় ও এর সহযোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটি, পারপ্লেক্সিটি এবং গুগল এআই ওভারভিউজের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে কোনো ব্র্যান্ডের উপস্থিতি নির্ভর করছে ‘জেনারেটিভ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন’ বা সংক্ষেপে ‘জিও’ (GEO)-র ওপর।
জেনারেটিভ সার্চ ইঞ্জিনগুলোর ডেটা প্রক্রিয়াকরণ কাঠামো বিশ্লেষণ করতে গবেষকরা ‘জিও-বেঞ্চ’ নামের একটি পরীক্ষামূলক ডেটাসেট তৈরি করেছেন। এতে ১০ হাজারেরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্ন বা অনুসন্ধান অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই পরীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব ডিজিটাল কনটেন্টে যাচাইযোগ্য পরিসংখ্যান, নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত থাকে, সেগুলো এআই তৈরি উত্তরে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি জায়গা পায়।
সার্চ ইঞ্জিনের ফলাফলে প্রবেশ করে লিংকে ক্লিক করার চেয়ে ব্যবহারকারীরা এখন এআই তৈরি সংক্ষিপ্ত বিবরণের ওপর বেশি নির্ভর করছেন। এই পরিবর্তিত ধারার সঙ্গে মানিয়ে নিতে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বিপণন সংস্থা তাদের কৌশল বদলে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রূপান্তর এমন একটি নতুন যুগের সূচনা করবে যেখানে বিশাল বিজ্ঞাপন বাজেট থাকা ব্র্যান্ডগুলোর চেয়ে উচ্চমানের ও মৌলিক কনটেন্ট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি সুবিধা পাবে।
ইনডেক্সার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বুনিয়ামিন সারাক আনাদোলুকে বলেন, ‘ইন্টারনেট ট্রাফিক যখন প্রচলিত ক্লিকভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে সরে আসছে, তখন এআই চ্যাটবটের উত্তর এবং এআই দিয়ে তৈরি সার্চ ইঞ্জিনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় যেসব ব্র্যান্ড স্থান পাচ্ছে, তারাই বেশি সফল হচ্ছে।’
সারাক উল্লেখ করেন, এআই ইঞ্জিনগুলো তাৎক্ষণিক অনুসন্ধানের ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ‘উৎস কর্তৃপক্ষের নির্ভরযোগ্যতা’, ‘সময়োপযোগিতা’ এবং ‘তথ্য আহরণের সক্ষমতা’র মতো বিশ্বাসযোগ্যতার সূচকগুলো ব্যবহার করে।
তিনি বলেন, ‘এই মডেলগুলোর নির্মাতারা তাদের উৎস নির্বাচনের প্রক্রিয়া পুরোপুরি প্রকাশ করেন না। ফলে নিশ্চিত কোনো সূত্রের কথা বলা যায় না, তবে গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণে এমন কিছু স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে যা এই মডেলগুলো অনুসন্ধান করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এআইয়ের প্রতিক্রিয়াগুলো দুটি উৎসের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত হয়—একটি হলো মডেলটি তৈরির কাজে ব্যবহৃত ডেটাসেট এবং অপরটি হলো প্রম্পটের উত্তর দেওয়ার মুহূর্তে তাৎক্ষণিক ওয়েব অনুসন্ধানের তথ্য।’
এআই সংক্ষিপ্তসার পাওয়ার পর ব্যবহারকারীদের ক্লিক করার প্রবণতা কমে যায় বলে উল্লেখ করেন সারাক। তিনি পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে জানান, গুগলে এআই সংক্ষিপ্তসার পড়েন এমন ব্যবহারকারীদের মধ্যে মাত্র আট শতাংশ ফলাফলে আসা লিংকে ক্লিক করেন। তবে যারা কোনো সংক্ষিপ্তসার দেখেননি, তাদের ক্ষেত্রে এই ক্লিকের হার ছিল প্রায় দ্বিগুণ।
তিনি বলেন, ‘তথ্য অনুসন্ধানের ক্ষেত্রগুলো থেকে ওয়েবসাইটের ট্রাফিক কমে যাবে বলে আমরা ধারণা করছি। কারণ যারা কোনো ওয়েবসাইটে ক্লিক করবেন, তারা ইতোমধ্যে এআই সংক্ষিপ্তসার পড়ে ফেলেছেন অথবা এআইয়ের মাধ্যমে অনুসন্ধান শেষ করে পণ্য কেনার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। ফলে সফলতার মাপকাঠি আর ক্লিকের সংখ্যার ওপর নির্ভর করবে না, বরং গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানে কোনো পণ্য বা ব্র্যান্ড কতবার সুপারিশ করা হয়েছে, সেটিই হবে মূল বিষয়।’
অ্যানালিথিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী এরদেম দাগদেমির আনাদোলুকে জানান, প্রথাগত সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও) মূলত প্রযুক্তিগত কোড এবং বিপুল পরিমাণের ডেটার ওপর জোর দিত, যা এখন আর যথেষ্ট নয়। তিনি ব্র্যান্ডগুলোকে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, বাস্তব গ্রাহক সন্তুষ্টি এবং স্বাভাবিক ডিজিটাল পদচিহ্নকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো নতুন পদ্ধতি গ্রহণের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘এআই তথ্যের পরিমাণের চেয়ে তার গুণগত নির্ভুলতা ও গভীরতা দেখে। এটি একটি ব্র্যান্ডের ডিজিটাল পদচিহ্ন মিলিয়ে তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং উৎসটি নির্ভরযোগ্য কি না কিংবা গ্রাহকরা সন্তুষ্ট কি না, তা যাচাই করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ব্র্যান্ডগুলোকে অবশ্যই গ্রাহক সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিকল্পনা করতে হবে, কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে এবং বিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, এসব ডিজিটাল পদচিহ্ন যদি ব্র্যান্ডের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে এআই সুপারিশের তালিকা থেকে সেই ব্র্যান্ডটিকে পুরোপুরি বাদ দিতে পারে।
দাগদেমির জানান, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো (এলএলএম) কোনো ব্র্যান্ড বা পণ্য ব্যবহারকারীদের কাছে সুপারিশ করা যায় কি না, তা নির্ধারণের জন্য অনলাইন ফোরাম এবং বিভিন্ন রিভিউ সাইট ঘেঁটে গ্রাহকদের ধারাবাহিক অভিযোগগুলো বের করে আনে। তিনি যোগ করেন, ভাসাভাসা কনটেন্টের মতো সেকেলে পদ্ধতি আঁকড়ে থাকা বিপণন দলগুলো তাদের প্রতিযোগীদের কাছে পিছিয়ে পড়বে, যারা নির্ভরযোগ্য ও যাচাইযোগ্য তথ্য পরিবেশন করে।
তিনি বলেন, ‘এআই চ্যাটবটগুলোর স্পষ্ট এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া মানুষকে এবং বিভিন্ন শিল্প খাতকে এই নতুন গতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য করছে। তুরস্কের ব্যবস্থাপনাও এখন এই পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু ব্র্যান্ড এখনও পুরনো কৌশলে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করলেও নতুন যুগের মূল নিয়মটি শুধু দৃশ্যমানতার নয়, বরং নির্ভরযোগ্যতার। তথ্যের ভিড়ে মানসম্মত কনটেন্টের যখন অভাব, তখন যেসব ব্র্যান্ড বিজ্ঞাপনকেন্দ্রিক কৌশল বাদ দিয়ে খাঁটি ও নির্ভুল তথ্য দেবে, তারা এআই অনুসন্ধানে প্রতিযোগীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকবে।’
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.