আপনি পড়ছেন

বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয়ের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের পুঞ্জীভূত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত দুই অর্থবছরে বিতরণ নেটওয়ার্কের এই অপচয় বাবদ সংস্থাটির মোট ৫ হাজার ১৪০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে, যা সরকারের এক বছরের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির মোট ভর্তুকির এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি।

সিস্টেম লসের মাশুল, দুই বছরে তিতাসের ক্ষতি ৫১৪০ কোটি
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের লোগো

পেট্রোবাংলার তথ্য ও তিতাসের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে সরকার ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। একই সময়ে তিতাস গ্যাসে অপচয় হয়েছে ২ হাজার ৭১৯ কোটি টাকার সমপরিমাণ গ্যাস। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অপচয়ের আর্থিক পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। নিজস্ব পাইপলাইন ও গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) থেকে সরবরাহ নেওয়া গ্যাসের পরিমাণের সঙ্গে গ্রাহক পর্যায়ে বিল হওয়া গ্যাসের পার্থক্যের ফলে এই ক্ষতি তৈরি হয়েছে।

সরকারি নীতিমালায় তিতাস গ্যাসের জন্য সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত সিস্টেম লসের সীমা নির্ধারিত রয়েছে। এই সীমার অতিরিক্ত অপচয়ের সমুদয় আর্থিক দায় প্রতিষ্ঠানটিকে নিজস্ব তহবিল থেকে সমন্বয় করতে হয়। ২০১৯-২০ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত সংস্থাটি সিস্টেম লস ২ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখতে সক্ষম হলেও ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে তা বাড়তে শুরু করে। ওই অর্থবছরে অপচয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ২৮ শতাংশে। পরবর্তীতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা রেকর্ড ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশে উন্নীত হয়।

নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্ধারিত সীমার চেয়ে ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশীয় পয়েন্ট অতিরিক্ত সিস্টেম লসের কারণে বিপুল পরিমাণ গ্যাস ক্রয়ের খরচ পরিশোধ করতে হলেও তার বিপরীতে কোনো রাজস্ব আদায় হয়নি। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোম্পানিটি ৫৯৫ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে এবং শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৬ দশমিক ০২ টাকায়। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট লোকসান ছিল ৭৭২ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ পর্যন্ত চার অর্থবছরে তিতাসের পুঞ্জীভূত নিট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। তবে টানা পরিচালন ঘাটতি সত্ত্বেও স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) সুদ ও আগের সঞ্চিত আয়ের ওপর ভিত্তি করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সুপারিশ করেছে পরিচালনা পর্ষদ।

নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান একনাবিন-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিতাস গ্যাস মোট ১৫ হাজার ৪২৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেলেও গ্রাহকদের কাছে বিল করতে পেরেছে ১৩ হাজার ৮৯২ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে ১ হাজার ৫৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অপচয় হয়েছে, যার বাজারমূল্য ২ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অপচয় হওয়া ১ হাজার ৪৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের আর্থিক মূল্য ছিল ২ হাজার ৪২১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।

এই অপচয়ের কারণ হিসেবে অবৈধ সংযোগ, ক্ষয়প্রাপ্ত পাইপলাইন, ড্রেনেজ ও রাস্তা সংস্কারের সময় পাইপলাইনের ক্ষয়ক্ষতি, ত্রুটিপূর্ণ মিটার এবং মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রাক্কলিত বিলিং পদ্ধতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তিতাস গ্যাসের ভিজিল্যান্স ডিভিশনের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আবু সাদাত মো. সায়েম জানিয়েছেন, সমস্যাগুলো নিরসনে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে প্রতি বছর সিস্টেম লস ও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। তিনি জানান, বিতরণ নেটওয়ার্কের বড় অংশ ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে তৈরি হওয়ায় পাইপলাইনের ৩০ বছরের স্বাভাবিক মেয়াদ আগেই শেষ হয়ে গেছে। পুরোনো অবকাঠামোর কারণে লিকেজমুক্ত গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আবু সাদাত সায়েম আরও উল্লেখ করেন, পৌর কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন সংস্থার খননকাজের সময় পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গ্যাস বের হয়ে যায়। এছাড়া শিল্প ও আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর স্থানীয় চক্রগুলো পুনরায় অবৈধ সংযোগ স্থাপন করায় অপচয় পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি জিটিসিএলের প্রধান ২৭টি হাই-প্রিসিশান মিটারের সঙ্গে তিতাসের নেটওয়ার্কে যুক্ত প্রায় দেড় হাজার সেকেন্ডারি মিটারের রিডিংয়ে অমিল দেখা যাচ্ছে।

আবাসিক গ্রাহকদের মিটারহীন ব্যবস্থার কারণেও আর্থিক ঘাটতি বাড়ছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ২০২২ সালের নিয়ম অনুযায়ী, এক চুলার জন্য মাসিক ৫৫ ঘনমিটার এবং দুই চুলার জন্য ৬০ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার নির্ধারিত রয়েছে। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ব্যবহার এই পরিমাণের চেয়ে বেশি। ২০২৩ সালে তিতাস প্রিপেইড মিটার না বসা পর্যন্ত এক চুলার ক্ষেত্রে ৭৬ দশমিক ৬৫ ঘনমিটার এবং দুই চুলার জন্য ৮৮ দশমিক ৮৮ ঘনমিটার সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব বিইআরসিতে জমা দিলেও তা এখনও কার্যকর হয়নি।

এদিকে কর কাঠামোর কারণেও আর্থিক চাপ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন তিতাস গ্যাসের অর্থ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. নূর হোসেন খান। তিনি বলেন, পরিচালন আয় কমে যাওয়ায় লভ্যাংশ দেওয়া ও দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় অ-পরিচালন আয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অর্থ আইন অনুযায়ী তিতাসের জন্য ২০ শতাংশ করপোরেট কর নির্ধারিত থাকলেও আইনটির ১৬৩ ধারা অনুযায়ী নির্দিষ্ট টার্নওভার ট্যাক্স দেওয়া বাধ্যতামূলক। ফলে কর-পূর্ব নিট লোকসান হওয়া সত্ত্বেও মোট বিক্রির ওপর ভিত্তি করে কোম্পানিটিকে এই ন্যূনতম কর পরিশোধ করতে হচ্ছে।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.